অরাজনৈতিক তাবলীগে রাজনীতির রং লাগলো কীভাবে?

 

অরাজনৈতিক তাবলীগে রাজনীতির রং লাগলো কীভাবে?

ভূমিকা


তাবলীগ জামাত একটি বিশুদ্ধ ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামের দাওয়াত প্রচার করা, মুসলমানদের ইমান ও আমলকে মজবুত করা এবং দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনা। এটি ছিল সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি সংগঠন, যা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নানা কারণে তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরে রাজনীতির প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, কিভাবে এই অরাজনৈতিক আন্দোলনে রাজনীতির রং লাগলো?

তাবলীগ জামাতের গোড়ার কথা

১৯২৭ সালে ভারতের মেওয়াত অঞ্চলে মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর হাত ধরে তাবলীগ জামাতের সূচনা হয়। এর মূলনীতিগুলো ছিল:

  1. ইমানকে মজবুত করা
  2. নামাজসহ ইসলামের মৌলিক আমলগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া
  3. দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দ্বীন প্রচার করা
  4. সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক থাকা এবং দুনিয়াবি লালসা থেকে দূরে থাকা

এই কারণেই তাবলীগ জামাতের কর্মীরা রাজনৈতিক বিতর্ক বা ক্ষমতার লড়াই থেকে দূরে থাকতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই দৃশ্যপট অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে।

রাজনীতির ছোঁয়া কিভাবে লাগল?

১. অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব


তাবলীগ জামাতের মূল নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এতে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে। ভারতে দারুল উলুম দেওবন্দ ও মাওলানা সাদ কান্ধলভির নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এই বিভক্তি বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে।

২. রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তাবলীগ জামাতের নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে সরকারকে মধ্যস্থতা করতে হয়েছে। যখন কোনো ধর্মীয় সংগঠনে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতির রং লেগে যায়। কাকরাইল মারকাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব, টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন নিয়ে বিরোধ—এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা পরোক্ষভাবে রাজনীতিকে তাবলীগের অভ্যন্তরে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

৩. রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে তাবলীগ জামাতের কিছু অংশকে সমর্থন দিয়েছে বা ব্যবহার করতে চেয়েছে। ফলে তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরো ঘনীভূত হয়েছে।

৪. আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব

তাবলীগ জামাত আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত একটি সংগঠন। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম রয়েছে। অনেক দেশে ইসলামের প্রচার ও সংগঠনগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ফলে রাজনীতির ছায়া পড়েছে তাবলীগ জামাতের ওপরও।

ভবিষ্যৎ পথ

তাবলীগ জামাত যদি সত্যিই তার প্রাথমিক আদর্শে ফিরে যেতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দূর করতে হবে এবং রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। নেতৃত্বের ঐক্য ফিরিয়ে আনা এবং মূল দাওয়াতি কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়াই হবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

উপসংহার

একটি অরাজনৈতিক সংগঠন কিভাবে সময়ের সাথে সাথে রাজনীতির রঙে রঙিন হয়ে যেতে পারে, তাবলীগ জামাত তার অন্যতম উদাহরণ। তবে এখনো সময় আছে এই সংগঠনকে তার মূল আদর্শে ফিরিয়ে নেওয়ার। দ্বীনি দাওয়াতকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখাই হবে এর টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।

Post a Comment

Previous Post Next Post